প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১০ ফেব্রুয়ারী : পরাধীন ভারতে জন্ম। বয়স ১০৩ বছর পেরিয়ে ১০৪ বছরে পড়েছে। তবুও বার্ধ্যক্য ভাতা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর বিধানসভার বত্রিশবিঘা গ্রামের বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিম। হাতের আঙ্গুলের ছাপ না ওঠার অজুহাতে তাঁকে বার্ধক্য ভাতা পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকতে হওয়ায় তিনি মুষড়ে পড়েছেন। ভোটের মুখে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় পড়ে গেছে বর্ধমানের রাজনৈতিক মহল ।
জামালপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এক অখ্যাত গ্রাম বত্রিশবিঘা। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামের আদি বাসিন্দা হলেন শেখ ইব্রাহিম। তিনি দাবি করেছেন,১৩২৯ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে তাঁর জন্ম।সেই অনুযায়ী বর্তমানে তাঁর বয়স ১০৪ বছর। শেখ ইব্রাহিম জানান,মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যের মানুষ নানা প্রকল্পের সুবিধা পেতে শুরু করেন। তা দেখে তিনি বার্ধক্য ভাতা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন ফর্ম পূরণ করে প্রশাসনের দফতরে জমা করেন। কিন্তু বার্ধক্য ভাতা তিনি পাননি ।হয়তো কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে, এমনটা ধরে নিয়ে ফের আর একবার তিনি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন ফর্ম পূর্রণ করে প্রশাসনের দফতরে জমা করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও বার্ধক্য ভাতা পাওয়ার সৌভাগ্য আজ অবধি তাঁর হয়নি।
ঠিক কি কারণে বার্ধক্য ভাতা জুটলো না ?এই প্রশ্নের উত্তরে দিতে গিয়ে শেখ ইব্রাহিম তাঁর বাম হাতের বুড়ো আঙ্গল দেখিয়ে বলেন,আমার হাতের আঙ্গুলের ছাপ নাকি উঠছে না। এই “অজুহাতের’ কথাই আমায় বলা হয়েছে“। তবে অজুহাত যাই দেখানো হোক না কেন,শতায়ু পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বার্ধক্য ভাতা না পাওয়ার আক্ষেপ চেপে রাখেননি শেখ ইব্রাহিম।কাঁপা গলায় তিনি বলেন,’আমার গ্রামের অনেক বয়স্ক মানুষ বার্ধ্যক্য ভাতা পাচ্ছেন।শুধু আমার’ই বার্ধক্য ভাতা পাওয়া হলো না। কি আর করবো,এটাকেই আমি আমার ভবিতব্য ধরে নিয়েছি।’ তাই বার্ধক্য ভাতা পাওয়ার জন্য কাউকে আর কিছু বলেননি বলে শেখ ইব্রাহিম জানিয়েছেন ।
এবিষয়ে জামালপুরের বিডিও পার্থসারথী দে বলেন,’এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। কেননা,বার্ধক্য ভাতা পেতে চেয়ে আবেদন করা কোন ব্যক্তির আঙ্গুলের ছাপতো আমাদের লাগে না।আমাদের লাগে,নির্ভুল আবেদনপত্র,আবেদনকারীর বয়সের প্রমাণপত্র,আধার কার্ড,ভোটার কার্ড আর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য ।’ বিডিও এও বলেন,’আমার মনে হচ্ছে শেখ ইব্রাহিমের বার্ধক্য ভাতা হয়তো অনুমোদন হয়ে গেছে । কিন্তু ব্যাঙ্কিং কোনও সমস্যার কারণে উনি বার্ধক্য ভাতা হাতে পাচ্ছেন না ।’
অন্যদিকে জামালপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান সাহাবুদ্দিন মণ্ডলের দাবি,’তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন কোনও সমস্যার কারণে বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিম তাঁর নিজের নামে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন নি। আর যেহেতু উনি ওনার “ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট“ নম্বর দিতে পারেন নি তাই বার্ধক্য ভাতার জন্য উনি আবেদন করলেও ওনার আবেদনের বিষয়টি নির্দিষ্ট সরকারী পোর্টালে আপলোড করা যায়নি।সেই কারণেই উনি বার্ধক্য ভাতা পাচ্ছেন না।
উপ-প্রধানের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিমের দুই ছেলে শেখ রায়হান উদ্দিন ও শেখ বাগবুল ইসলাম জানান,তাঁদের বাবার হাতের আঙ্গুলের ছাপ(Finger Print) উঠছে না বলে গ্রামে আয়োজন করা শিবিরে তাঁদের বলা হয়েছিল।আঙ্গুলের ছাপ না ওঠার কারণে বাবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে না বলে তাঁদের জানিয়েও দেওয়া হয়েছিল ।
যদিও আঙ্গুলের ছাপ (Finger Print) না ওঠার কারণে কেউ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেননি, এই যুক্তি একদমই মানতে চাননি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়ার (SBI)জামালপুরের শুঁড়েকালনা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার কৃষ্ণ নন্দন কুমার পোদ্দার। তিনি জানান,ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য হাতের আঙ্গুলের ছাপ (Finger Print) লাগে না। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যে কেউ খুলতে চাইলে তাঁকে তাঁর সাম্প্রতিক সময়ের ফটো, ভোটার ও আধার কার্ডের তথ্য সহ সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক থেকে দেওয়া ফর্ম পূরণ করে জমা করতে হয় । এই নিয়ম মেনে প্রবীণ শেখ ইব্রাহিম যদি তাঁর ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে চান অবশ্যই ওনার অ্যাকাউন্ট খুলে দেবেন বলে কৃষ্ণ নন্দন কুমার পোদ্দার জানিয়েছেন।
এদিকে শতায়ু পার করে যাওয়া বৃদ্ধর বার্ধক্য ভাতা না পাওয়ার পিছনে কারণ যাই থাক না কেন, বিরোধীরা অবশ্য এ নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন,’ভোটের মুখে সারা বাংলা জুড়ে “উন্নয়ন পাঁচালির“ গাড়ি ঘোরাচ্ছে তৃণমূল।কিন্তু বাস্তবে বাংলার মানুষের কি উন্নয়ন হয়েছে সেটা ১০৪বছর বয়সী জামালপুরের প্রবীণ বাসিন্দা শেখ ইব্রাহিমের বার্ধক্য ভাতা না পাওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে দিচ্ছে ।’।

