পারমিতা দত্ত,নদীয়া,০৭ ফেব্রুয়ারী : চড়া দামে ইটভাটায় বিক্রি হচ্ছে মাটি । সেই লোভে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাটি মাফিয়ার দল । তারা একদিকে কৃষিজমি থেকে দেদার মাটি উত্তোলন করে কৃষিকাজে ব্যাপক ক্ষতি করে দিচ্ছে, পাশাপাশি গ্রামবাসীদের নিজ উদ্যোগে তৈরি চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তা দিয়ে অসংখ্য ট্রাক্ট্রর ও লরি যাতায়াতের ফলে রাস্তার দফারফা করে করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ । সেই সাথে ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বিরূপ প্রভাব ফেলছে পরিবেশের উপর । মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য রুখতে নদীয়া জেলার শান্তিপুর ব্লকের গয়েশপুর পঞ্চায়েতের মানিকনগর চড়ের বাসিন্দারা সম্প্রতি ‘জমি রক্ষা কমিটি’ গঠন করে রুখে দাঁড়ায় । কমিটির অভিযোগ যে বিষয়টি নিয়ে তারা জেলা শাসকের কাছে দ্বারস্থ হলেও এখনো পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে কোনো সদর্থক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি ।
জানা গেছে,শান্তিপুর ব্লকের গয়েশপুর পঞ্চায়েতের মানিকনগর গ্রামের পাশ দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে ভাগিরথী নদী । যেকারণে মানিকনগর চড় সংলগ্ন কৃষিজমি খুবই উর্বর । জমিগুলি তিন ফসলি৷ মূলত চাষবাসের উপরেই গ্রামের জীবন জীবিকা নির্ভর করে। জমিগুলি দোয়াঁশ মাটি হওয়ায় পাশাপাশি ওই সমস্ত জমির মাটি ইঁট তৈরির জন্য খুবই উপযোগী । সেই ভরসায় আশপাশে অন্তত ৫ টি ইঁটভাটা গজিয়ে উঠেছে । আর ভাটায় মাটি সরকারের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাটি মাফিয়া চক্র ।
গ্রামবাসীরা জানান,যে মাটির দাম ৩০০ টাকা প্রতি ট্রাক্টর সেখানে ভাটায় দিলে মিলছে ১০০০ টাকা করে । আর এই টাকার লোভে মানিকনগর চড় সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে দেদার মাটি তুলে নিচ্ছে মাটি মাফিয়ারা । যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আশপাশের কৃষি জমিগুলিতে । স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল মণ্ডলের কথায়, ‘চড়ে আমার কিছুটা কৃষিজমি রয়েছে । ওই জমির ভরসায় আমার পরিবারের সারাবছর খরচ খরচা চলে । কিন্তু অবৈধ মাটি খননের ফলে আমার জমির কিছুটা দুরেই ১০ থেকে ১৫ বিঘা কৃষিজমি ভাগিরথীর গর্ভে চলে গেছে । এদিকে নদীর পাড়ও বাঁধানো নেই । ফলে আমাদের জমি কবে নদীগর্ভে চলে যায় সেই আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি ।’
শুক্রবার মানিকনগর চড়ের ‘জমি রক্ষা কমিটি’র পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয় এলাকায় । কমিটির নেতা জুনাইদ সাহেবের নেতৃত্বে আয়োজিত এই প্রতিবাদ মিছিল থেকে অবিলম্বে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন বন্ধ করার দাবি জানানো হয় । জুনাইদ বলেন,’আমাদের তিন ফসলি জমি । দীর্ঘদিন ধরে মাটি কাটার জন্য জমিগুলো বর্বাদ হয়ে যাচ্ছে । যদিও এখনো মাটি কাটা শুরু হয়নি,তবে শীঘ্রই হবে বলে আমাদের অনুমান । তাই ফের যাতে মাটি কাটা শুরু না হয় সেজন্য আমরা আগে থেকেই মাটি কাটা রুখতে আন্দোলনে নেমেছি ।’
জানা গেছে,গ্রামবাসীদের ক্ষোভের আর একটা কারন হল প্রচুর সংখ্যায় ট্রাক্টর ও লরি ভাটায় যাতায়াতের ফলে রাস্তার বেহাল অবস্থা । গ্রামবাসীদের অভিযোগ, মানিকনগর গ্রামের চলাচলের রাস্তা দীর্ঘদিন বেহাল অবস্থায় ছিল । পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের কাছে বহু তদ্বির করেও রাস্তা সংস্কারের কাজ হয়নি । বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীরা বছর খানেক আগে নিজেদের শ্রমে চলাচলের উপযোগী একটি কাঁচা রাস্তা তৈরি করেছিলেন । কিন্তু ইটভাটার মাটির ট্রাক্টর ও ইট বোঝাই লরির যাতায়াতের কারনে রাস্তাটি ফের বেহাল হয়ে পড়েছে । ওই ইটভাটাগুলোর জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাক্টর ও লরি যাতায়াত করে বলে জানিয়েছেন তারা । সালাম শেখ নামে এক প্রতিবাদী কৃষকের অভিযোগ, ‘আমরা মাটি মাফিয়াদের বহুবার গ্রামের রাস্তা দিয়ে ট্রাক্টর ও লরি চলাচল বন্ধ করার জন্য বলেছিলাম । কিন্তু ওরা উলটে আমাদের হুমকি দিচ্ছে । বলছে,ইঁটভাটার মালিকদের প্রচুর টাকা । বেশি লাফালাফি করিস না । তোরা কিছুই করতে পারবি না।’
যদিও গয়েশপুর পঞ্চায়েতের স্থানীয় তৃণমূল সদস্য কামাল হোসেন শেখ দাবি করেছেন,’বর্তমানে কোনো ট্রাক্টর বা লরি যাতায়াত করা দেখতে পাচ্ছি না । মাটি কাটাও চলছে না । হয়তো ভবিষ্যতে হতে পারে বলে গ্রামবাসীরা আগে থেকেই প্রতিবাদ শুরু করেছেন ।’ যদিও ‘জমি রক্ষা কমিটি’ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে
উন্নয়নের নামে তাদের জীবিকা ও পরিবেশ ধ্বংস করা মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তারা। তাদের দাবি প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক । অবৈধ মাটি কাটায় রাশ টানা হোক এবং রাস্তাটিকে পাকাপাকিভাবে নির্মাণ করা হোক।।

