এইদিন ওয়েবডেস্ক,গুয়াহাটি,৩০ জানুয়ারী : দিন কয়েক আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছিলেন,’মিঁয়াদের (বাংলাদেশি মুসলিমদের বিদ্রুপ করে ‘মিঁয়া’ বলা হয় আসামে) যত পারো উৎপাত করো । আমি বিজেপি কার্যকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি মিঁয়াদের দেখলেই ফর্ম-৭(সন্দেহজনক ভোটার) যত খুশি জমা দাও । আমি বিজেপির কার্যকর্তাদের বলেছি,যত খুশি মিঁয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান । এতে কোনো লুকোছাপা নেই । আমি মিটিং করেছি,ভিডিও কনফারেন্স করে বলেছি যে যত খুশি ফর্ম জমা দাও । তাতে তারা দৌড়াদৌড়ি করে,বুঝতে পারে যে অসমিয়া জাতি জেগে উঠেছে । এতে কংগ্রেসের আপত্তি থাকলে থাকতে পারে । তাতে আমি কি করতে পারি ?’
তার এই মন্তব্য নিয়ে বিস্তর জলঘোলা করতে শুরু করে বামপন্থীরা৷ এমনকি বামপন্থী পোর্টাল ‘দ্য ওয়্যার’-এর মৌলবাদী সাংবাদিক আরফা খানুম শেরওয়ানি সুপ্রিম কোর্টের কাছে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি পর্যন্ত জানান । শুধু বামপন্থীরাই নয়,কংগ্রেসও হেমন্ত বিশ্বশর্মার ‘মিয়া’ মন্তব্যে বেজায় চটেছে । আজ শুক্রবার কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান পবন খেরা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি পাকিস্তান প্রসঙ্গ তুলে কথিত দুর্নীতি এবং ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছেন। খেরা দাবি করেন, মোদির সঙ্গে যুক্ত কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে আদিবাসী ও স্থানীয়দের দেড় লক্ষ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। খেরা বলেন, আদিবাসীদের জমির অধিকার, চা শ্রমিকদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের প্রতিশ্রুতি এবং মোদি ও শাহের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ১২ বছর ধরে ছয়টি উপজাতির জন্য তফসিলি উপজাতি (এসটি) মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে শর্মার কাছে কোনো উত্তর নেই। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় তিনি সুশাসনের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য মেরুকরণের বক্তব্য ব্যবহার করছেন।
ওই সমস্ত সমালোচকদের বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের সম্পর্কে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন হেমন্ত বিশ্বশর্মা ।
এই প্রসঙ্গে তিনি এক্স-এ লিখেছেন,’যারা আসামে বাংলাদেশি মুসলিম অবৈধ অভিবাসনের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি শব্দ ‘মিয়াঁ’ সম্পর্কে আমার মন্তব্যের জন্য আমাকে আক্রমণ করছেন, তাদের উচিত একটু থেমে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আসাম সম্পর্কে কী বলেছে তা পড়া। এটি আমার ভাষা নয়, আমার কল্পনা নয়, এবং কোনো রাজনৈতিক অতিরঞ্জনও নয়। এগুলো আদালতের নিজস্ব শব্দ :
“আসামে নীরব ও অশুভ জনসংখ্যাগত আগ্রাসনের ফলে নিম্ন আসামের ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে… অবৈধ অভিবাসীদের আগমনের ফলে এই জেলাগুলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে… এরপরই হয়তো বাংলাদেশের সাথে সেগুলোর অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলার বিষয়টি কেবল সময়ের ব্যাপার হবে… নিম্ন আসাম হাতছাড়া হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমগ্র ভূখণ্ড ভারতের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সেই অঞ্চলের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ জাতি হারাবে।”
তিনি লিখেছেন,’যখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত ‘জনসংখ্যাগত আগ্রাসন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে এবং ভূখণ্ড ও জাতীয় ঐক্যের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করে, তখন সেই বাস্তবতা স্বীকার করাটা কোনো ঘৃণা বা সাম্প্রদায়িকতা নয়, কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণও নয়। এটি একটি গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার স্বীকৃতি, যা নিয়ে আসাম কয়েক দশক ধরে বসবাস করছে।’ তিনি আরও লিখেছেন,’আমাদের প্রচেষ্টা কোনো ধর্ম বা কোনো ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের প্রচেষ্টা হলো আসামের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করা, ঠিক যেভাবে সুপ্রিম কোর্ট জাতিকে সতর্ক করেছে। সেই সতর্কতা উপেক্ষা করাই হবে আসল অবিচার—আসাম এবং ভারতের প্রতি।’
আজ গুয়াহাটিতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, “…বিজেপি শুধু কথার মাধ্যমে কাজ করে না; বিজেপি কাজের মাধ্যমে কাজ করে। যখন আমরা বলি যে আমরা অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে, তখন আমরা সত্যিই তা-ই বোঝাই। একারণেই আমাদের কর্মীরা পাঁচ লক্ষেরও বেশি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তা না হলে, সবাইকে স্থানীয় বলে ঘোষণা করা হতো। অন্তত আজ বিজেপি এটা দেখানোর চেষ্টা করেছে যে আসামে অসমীয়া মানুষ এখনও আত্মসমর্পণ করেনি। বিজেপির কর্মীরা আজ এটি প্রমাণ করেছেন। তা না হলে, সবকিছু ইতিমধ্যেই আত্মসমর্পণ করা হয়ে যেত।”
এদিকে আসামের জনবিন্যাসের পরিবর্তনের জন্য কংগ্রেসকে দায়ি করে আজ শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন যে কংগ্রেসের ২০ বছরের শাসনকালে আসামের জনসংখ্যাগত কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে এবং তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে রাজ্যের ৭টি জেলা “৬৪ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর দ্বারা প্রভাবিত”। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে কেবল বিজেপিই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারে এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আবারও দলটিকে নির্বাচিত করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকারের বেদখল উচ্ছেদ অভিযানের প্রশংসা করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে বিজেপি যদি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফেরে, তবে আসামের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অবৈধ বসতিগুলো “একে একে” উচ্ছেদ করা হবে।।

