UGC Controversy : উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দেশের হিন্দুত্ববাদের ‘ফায়ার ব্রান্ড’ নেতা হিসাবে পরিচিত । তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এতটাই যে যোগীকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখতে শুরু করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ সংখ্যক মানুষ । আর এতেই নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের জোট নাকি প্রমাদ গুনছেন ! তাই যোগীর জনপ্রিয়তায় লাগাম টানতে মোদী-শাহ মাস্টারপ্লান হিসাবে নতুন ইউজিসি বিধিমালা নিয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠছে । এনিয়ে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে বিজেপি বিরোধী প্রবল হাওয়া চলছে । যারা এতদিন মোদীর সমর্থনে গলা ফাটাতেন তারা এখন যোগীর সমর্থনে প্রকাশ্যে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদগার করছেন । মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের জেনারেল কাস্ট ও ব্রাহ্মণরা এই বিধিমালায় চরম ক্ষুব্ধ । মিছিলও হচ্ছে । এমনকি কোনো কোনো সাধুসন্ন্যাসী বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আওয়াজ পর্যন্ত তুলতে শুরু করেছেন । ইউজিসি বিধিমালা নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোষের মুখে পড়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান । উচ্চবর্ণের সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা গত ২৭ জানুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদর দপ্তরের বাইরে বিক্ষোভও দেখিয়েছেন । নতুন ইউজিসি নিয়মকানুন নিয়ে জাতীয় বিতর্ক ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বেশ কয়েকটি রাজ্যের ছাত্র, শিক্ষক এবং সামাজিক গোষ্ঠীগুলির তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সরকার এই নিয়মগুলিকে উচ্চশিক্ষায় ন্যায্যতা এবং জবাবদিহিতা উন্নত করার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও, সমালোচকরা যুক্তি দেন যে এটি সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে এবং ক্যাম্পাসগুলিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অভিযোগ উঠছে,যে মোদী “বাটেঙ্গে তো কাটেঙ্গে” শ্লোগান তুলেছিলেন, তিনিই এখন হিন্দুদের বিভক্ত করার খেলায় মেতেছেন ।
প্রসঙ্গত,উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) আনা নতুন ‘প্রোমোশন অফ ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশন’ বিধি (UGC Equity Rules Stay) আনা হয়েছিল । যা নিয়ে প্রবল বিরোধিতায় নেমেছে উচ্চবর্ণ সম্প্রদায় । তাদের অভিযোগ যে এতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়বে । বিতর্কের মূলে কী?
ইউজিসির নতুন বিধিতে প্রতিটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি ‘ইকুয়াল অপরচুনিটি সেন্টার’ এবং ‘ইকুইটি কমিটি’ গঠন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল। এই কমিটিতে মূলত তপশিলি জাতি (SC), উপজাতি (ST), অনগ্রসর শ্রেণি (OBC), বিশেষভাবে সক্ষম এবং মহিলা সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির কথা রয়েছে। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার স্বীকৃতি বা বৈধতা বাতিলের মতো কড়া ব্যবস্থার সংস্থানও রাখা হয়েছে নতুন নিয়মে।
এই বিধির বিরোধিতায় সরব হয়েছে অসংরক্ষিত বা জেনারেল ক্যাটিগরির পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, এই নিয়ম আদতে ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নষ্ট করবে। তাঁদের দাবি: নতুন বিধি অস্পষ্ট এবং এর অপব্যবহারের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
একপক্ষীয় অভিযোগের ভিত্তিতে যেকোনো পড়ুয়া হেনস্থার শিকার হতে পারেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কমে যাওয়ার ভয় থাকছে।
নতুন ইউজিসি বিধিমালায় সমস্যাগুলো কী কী ?
বলা হচ্ছে যে, ১. “ক্যাম্পাসগুলোতে ব্যাপক জাতিগত বৈষম্য” সংক্রান্ত একটি ত্রুটিপূর্ণ অনুমানের (অর্থাৎ মিথ্যা বর্ণনার) উপর ভিত্তি করে তৈরি – এই ধরনের দাবির সমর্থনে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই।
২. “বৈষম্য”-এর সংজ্ঞা প্রসারিত ও অস্পষ্ট করা হয়েছে। যেকোনো “অপ্রকাশ্য” কাজ, “উদ্দেশ্য” ছাড়াই করা যেকোনো কাজকেও বৈষম্য হিসেবে গণ্য করা হতে পারে, যদি কেউ তা মনে করে।
৩. জাতিগত বৈষম্যের সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধুমাত্র এসসি, এসটি, ওবিসি-দের সম্ভাব্য শিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ শ্রেণীকে জাতিগত বৈষম্যের সম্ভাব্য শিকার হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে “নিপীড়ক” হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
৪. অভিযোগকারীর উপর প্রমাণের কোনো দায়ভার নেই। এটি “দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ” নীতির পরিবর্তে “নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী” নীতির উপর কাজ করে।
৫. মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এর মানে হলো, মানুষকে কোনো পরিণতির ভয় ছাড়াই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করার অবাধ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
৬. ক্যাম্পাসে সুশীল সমাজের সদস্য, এনজিও এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা। এটি পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে রাজনৈতিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
৭. বৈষম্যের পরিধি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রসারিত করা হয়েছে।
এর মানে হলো, এখন শিক্ষক বা কর্মীরাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। আরও খারাপ বিষয় হলো, এখন এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে একজন সাধারণ শ্রেণির শিক্ষার্থী একজন তফসিলি জাতি/তফসিলি উপজাতি/অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষককে “বৈষম্যের” শিকার করতে পারে।
৮. অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সীমিত সময়সীমা। এর মানে হলো অত্যন্ত কঠোর সময়সীমা: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটির বৈঠক, ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন এবং ৭ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ।
৯. সমতা স্কোয়াড এবং ইউনিট-স্তরের সমতা দূতদের মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন নজরদারি। এটি একটি ভীতিকর পরিবেশ, গুপ্তচরবৃত্তি, আস্থার অভাব এবং ক্যাম্পাসে এই ধরনের দূতের ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করে।
১০. নিয়ম না মানলে কলেজগুলোর জন্য শাস্তির বিধান। যা কলেজগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আমলাতন্ত্র অনুসরণ করতে বাধ্য করবে এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত, এজেন্ডা-নির্ভর এনজিও ও সুশীল সমাজগুলোর জন্য দরজা খুলে দেবে।
অভিযোগ করা হচ্ছে যে এই ধরনের নির্দেশিকা জারি করার মাধ্যমে ইউজিসি তার ১৯৫৬ সালের ইউজিসি আইনের সীমা অতিক্রম করেছে।
এই নির্দেশিকার সামগ্রিক প্রভাব:
– শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে constante ভয় ।
– লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ভয়ে শিক্ষকরা মূল্যায়নের মান শিথিল করতে পারেন।
– শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাস্থা বাড়ায় ।
– ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক সংঘাত মেটানোর জন্য এই বিধানগুলোর অপব্যবহার ।
– সাধারণ শ্রেণির (শিক্ষার্থী ও শিক্ষক) ওপর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে ।
– কার্যকরভাবে ক্যাম্পাসগুলোকে গেস্টাপোতে পরিণত করে ।
যদিও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) আনা নতুন ‘প্রোমোশন অফ ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশন’ বিধিতে (UGC Equity Rules Stay) স্থগিতাদেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই নতুন বিধি সমাজে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিতে বিপরীত ঘটিয়ে নতুন করে ‘বৈষম্য’ সৃষ্টি করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ কেন্দ্র ও ইউজিসি-কে আগামী ১৯ মার্চের মধ্যে এ বিষয়ে রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে। ততদিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে ২০১২ সালের পুরনো রেগুলেশনই।
বিজেপির অভ্যন্তরেই হচ্ছে সমালোচনা
ইউজিসি-র নতুন বিধিমালা প্রসঙ্গে রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ এবং বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র বলেছেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কের মধ্যে টেনে আনা ঠিক নয়…এমন একটি বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু আমি যা আশঙ্কা করছি, এবং যা মানুষ খোলাখুলি বলছে না, তা হলো এই বিধিমালাগুলোর পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হবে। শিক্ষার্থীরা যে কোনো জাতিরই হোক না কেন, তারা সেখানে পড়াশোনা করতে এসেছে এবং তাদের এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে যে, যাই ঘটুক না কেন, এমনকি সামান্য ঝগড়া হলেও—অভিযোগ দায়ের করো এবং কারো জীবন নষ্ট করে দাও। তাই এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমি মনে করি, ইউজিসি-র এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত…সরকারেরও এ বিষয়ে ভাবা উচিত…”

