আয়াতুল্লাহ আলি খোমিনির নেতৃত্বাধীন ইসলামি শাসনের পতনের দাবিতে আন্দোলনকারীদের নৃশংস বর্বরোচিত দমনপীড়ন চলছে ইরানে । গোটা বিশ্বকে অন্ধকারে রেখে গনহত্যা চালাচ্ছে খোমিনির বাহিনী । ইরানে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো অজানা। প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে । কিন্তু কিছুদিন আগে “ফ্রি প্যালেস্টাইন” বলে চিৎকার করা বামপন্থীরা ইরানের গনহত্যা নিয়ে সন্দেহজনকভাবে নীরব৷ কেউ কেউ বলছেন বামপন্থীদের ইরানের গনহত্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা ইরানের গণহত্যা নিয়েও চিন্তিত নয়,কারন তাদের এজেন্ডার সাথে খাপ খায় না৷ তারা কোনো প্রকৃত অর্থে কোনো ‘মানবতাবাদী’ নয়।তারা গাজা নিয়ে কথা বলে কারণ এর সাথে ইসরায়েল জড়িত । আর এটা তাদের এজেন্ডার সাথে খাপ খায় ।
ইরানের সাম্প্রতিক দমনপীড়ন নিয়ে মার্কিন বামপন্থী তথাকথিত ‘মানবতাবাদী’ বারাক হুসেন ওবামা, কমলা হ্যারিস এবং ন্যান্সি পেলোসির নীরবতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে । তাদের এই নীরবতার কারন নিয়ে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী তাদের নিজের নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে ব্যাখ্যাও করছেন । মার্টিন শেদি নামে একজন বুদ্ধিজীবী এক্স-এ লিখেছেন,ইরানের গণহত্যা নিয়ে বারাক ওবামা, কমলা হ্যারিস এবং ন্যান্সি পেলোসির নীরবতা আকস্মিক নয়। কেন ? কারন ইরানের বিপ্লবটি জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ।এটি ‘ইরান প্রথম’ নীতিতে বিশ্বাসী, উগ্র ইসলামপন্থী এবং ধর্মতন্ত্রবিরোধী। এটি সরাসরি বিশ্বায়নবাদী মতাদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক, যা জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রকে অবিশ্বাস করে।
এটি রাজনৈতিক ইসলামের ব্যর্থতাকে উন্মোচন করে। তাই ইরানিদের সমর্থন করার অর্থ হবে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে, “ইসলামী আন্দোলনগুলোর” সাথে পশ্চিমা বিশ্বের কয়েক দশকের সম্পৃক্ততা একটি নৃশংস শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। এটি এমন একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতা যা তারা স্বীকার করতে চায় না। এটি বামপন্থীদের পরিচিত রাজনীতির সাথে খাপ খায় না। ইরানি বিক্ষোভকারীরা পশ্চিমা প্রগতিশীল স্লোগান দিচ্ছে না। তারা সার্বভৌমত্ব, সংস্কৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি জানাচ্ছে। এটি তাদের জন্য একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে । তিনি লিখেছেন,নীরবতা অতীতের নীতিগুলোকে রক্ষা করে। ইরান নিয়ে কথা বললে পারমাণবিক চুক্তি, তোষণ নীতি এবং নিজেদের জনগণকে হত্যাকারী একটি শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নগুলো আবার সামনে চলে আসবে। ইরানি বিপ্লব ইসলামপন্থী আখ্যান এবং বিশ্বায়নবাদী নিয়ন্ত্রণ উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে। একারণেই বিশ্বায়নবাদী বামপন্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
জিম চিমিরি (@JChimirie66677) লিখেছেন,পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এক তাৎপর্যপূর্ণ নীরবতা বিরাজ করছে। এটি অজ্ঞতার নীরবতা নয়, বরং পছন্দের নীরবতা। ইরানে মানুষ রাস্তায় নেমে স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছে। এর জবাবে সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে এবং রক্তপাতের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এভাবেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র কোনো সাক্ষী ছাড়াই মানুষ হত্যা করে। আমরা আগেও এটা দেখেছি। এরপর কী ঘটবে, তা আমরা ঠিকই জানি। এবং তা সত্ত্বেও পশ্চিমা বামপন্থীরা, যারা অন্য সব অবিচারের বিরুদ্ধে এত সোচ্চার, তারা এ বিষয়ে প্রায় কিছুই বলছে না।
ইরানি রাষ্ট্র শুধু ভিন্নমতকে সেন্সর করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা আলো নিভিয়ে দিয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়াটা জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। এটা পূর্বপরিকল্পিত । ২০১৯ সালে, একই কৌশল প্রয়োগ করে প্রায় ১৫০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আজ, শতাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে, আলী খামেনেইয়ের শাসনকালে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কাঁদানে গ্যাস, সরাসরি গুলি, গণগ্রেফতার। শিশুদের মৃত্যু। মর্গে লাশের স্তূপ। আর বিদেশে নীরবতা।
তিনি লিখেছেন,এই নীরবতা যা আরও নিন্দনীয় করে তোলে তা হলো, এখানে কোনো কিছুই অস্পষ্ট নয়। বিক্ষোভকারীরা ধার করা স্লোগান দিচ্ছে না বা তাদের কারারক্ষীদের সাথে ‘আলোচনার’ আহ্বান জানাচ্ছে না। তারা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। তারা শাসনের প্রতীকগুলো ভেঙে ফেলছে। তারা এমন একটি ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অবসান চায় যা নারীদের মারধর করে, বিরোধীদের জেলে পোরে এবং সন্ত্রাস রপ্তানি করে। তারা স্বাধীনতা চায়, স্পষ্টভাবে এবং কোনো আড়াল ছাড়াই। এটা ক্ষোভের জন্ম দেওয়া উচিত। কিন্তু তা হয় না। পরিবর্তে, আমরা সেই পরিচিত দ্বিধাগ্রস্ত ভাষা শুনতে পাই। ‘সংযমের’ আহ্বান। ‘সম্পৃক্ততার’ আবেদন। এমন প্রাণহীন বিবৃতি যা হয়তো স্বয়ং শাসকগোষ্ঠীই তৈরি করেছে। ব্রিস্টলের মূর্তি এবং প্যারিসের পুলিশি কৌশল নিয়ে যারা সোচ্চার হন, তারাই হঠাৎ সতর্ক হয়ে যান যখন একটি ধর্মীয় স্বৈরশাসন অন্ধকারে নিজের দেশের মানুষকে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়।
ভেরিয়া আমিরি (@veriaamiri) লিখেছেন,ইরান কোনো আলোচনার বিষয় নয়।এটি কোনো ‘পাল্টা আখ্যান’ নয়। এটি আপনার পশ্চিমা-বিরোধী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির কোনো দাবা খেলার ঘুঁটি নয়।বামপন্থীদের একটি অংশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, যতক্ষণ কোনো গোষ্ঠী বা শাসনব্যবস্থা পশ্চিমা-বিরোধী থাকবে, ততক্ষণ তাদের অপরাধ ও নৃশংসতা ধর্তব্যের মধ্যে আসবে না। এই যুক্তিই তাদের হামাসকে ক্ষমা করতে এবং ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অপরাধকে ধামাচাপা দিতে পরিচালিত করেছে।
যেসব সংগঠন বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করে, নারীদের দমন করে, ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন করে এবং ভয়ের মাধ্যমে শাসন করে, তাদের রক্ষা করার পাশাপাশি আপনি মুক্তির পক্ষে দাঁড়ানোর দাবি করতে পারেন না। এটা সংহতি নয়, এটা নৈতিক অবক্ষয়।যদি ভুক্তভোগীরা আপনার আখ্যানের সাথে খাপ না খেলে আপনার সহানুভূতি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আপনি ন্যায়বিচার রক্ষা করছেন না।আপনি ক্ষমতাকে রক্ষা করছেন, ঠিক সেই ডানপন্থীদের মতোই যাদের আপনি এত বিরোধিতা করেন, শুধু আপনার স্লোগানগুলো ভিন্ন।ইরান আপনার আখ্যান নয়।ইরান এমন একটি জাতি, যাদের স্বাধীনতা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং সত্য প্রাপ্য।
প্রসঙ্গত,বামপন্থীরা যে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডায় চলে,তারা যে আদপেই কোনো মানবতাবাদী নয়,তার প্রমান বহুবার দিয়েছে । বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দু নরসংহার নিয়ে তারা নীরব হলেও তারা ছোটো খাটো ঘটনায় ভারতে মুসলিমদের উপর “হিন্দুত্ববাদীদের” কথিত হামলা নিয়ে তারা গলা ফাটায় । বামপন্থীরা ততক্ষণ মানবতার কথা বলে,সংবিধান রক্ষার কথা বলে, যতক্ষণ তাদের এজেন্ডার সাথে খাপ খায় । ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তোষামোদ আর মানবতা রক্ষার নামে রাজনৈতিক এজেন্ডা চালানো তাদের পুরনো অভ্যাস । একারণে গোটা বিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের অস্তিত্ব ।।

