গতকাল ছিল ভারত মাতার সুযোগ্য সন্তান “দ্য লিবারেটর অফ ইন্ডিয়া” নেতাজী সুভাসচন্দ্র বোসের জন্মজয়ন্তী । এই দিনটিতে রাজ্যের দলীয় কার্যালয়গুলিতে “ছাত্র যুব উৎসব” কর্মসূচি পালন করেছে বামপন্থী দল সিপিএম । কিন্তু এই বিশেষ দিনে নেতাজীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা জহরলাল নেহেরুর পাশাপাশি একজন বামপন্থীর নাম আলোচনায় উঠে আসছে । যে শুধুমাত্র অর্থের বিনিময়ে নেতাজীর মহানিষ্ক্রমণের পর গোপন খবর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের দিয়েছিল । আর সেই বামপন্থী হল ভগতরাম তলোয়ার । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমান পাকিস্তান) একজন সক্রিয় কমিউনিস্ট এবং কীর্তি কিষাণ পার্টির সদস্য ভগতরাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশ্বের একমাত্র “কুইন্টুপল এজেন্ট” হিসেবে পরিচিত ছিলেন । যিনি জার্মানি, ইতালি, জাপান, সোভিয়েত রাশিয়া ও ব্রিটেনের হয়ে কাজ করেছেন এবং ব্রিটিশরা তাঁকে ‘সিলভার’ কোডনাম দিয়েছিল৷ লেখক ও সাংবাদিক মিহির বোস “সিলভার: দ্য স্পাই হু ফুলড দ্য নাৎসি ” বইতে তার কীর্তি বর্ণনা করেছেন । তার লেখা “দ্য ইন্ডিয়ান স্পাই”-এর ৩২০ পৃষ্ঠায় নেতাজির সঙ্গে ভগতরাম তলোয়ারের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে ।
আসলে,কমিউনিস্ট ভগতরামের গুপ্তচরবৃত্তির হাতেখড়ি হয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মাধ্যমে। নেতাজিই জার্মানদের সঙ্গে ভগতরামের যোগাযোগ করিয়ে দেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিলে ভগতরাম সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নেতাজির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে। জার্মানদের মাধ্যমে পাঠানো প্রতিটি তথ্য রাশিয়ার হাতে তুলে দেয় এবং জার্মানদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে। নেতাজির উদ্দেশ্য ছিল উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতি এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু সদস্যদের মাধ্যমে এক সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা। কিন্তু ভগতরামের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে তার ব্যর্থ হয়।
১৯৪২ এর ডিসেম্বরে পেশোয়ারে ভগতরামকে গ্রেফতার করে ব্রিটিশ পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ভগতরাম নেতাজিকে “বিশ্বাসঘাতক ” বলে অভিহিত করে এবং বলে সে ঠান্ডা মাথায় সুভাষচন্দ্র বসুর সহযোগীদের সঙ্গে বেইমানি করেছে। ভগতরামের বেইমানির ফলে কাবুলের ভারতীয় ব্যবসায়ী উত্তম চন্দসহ অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী গ্রেফতার হন। উত্তম চন্দ হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কাবুলে নেতাজিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভগতরামকেও আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং আরও অনেক ভাবেই সাহায্য করেন তাকে । ভগতরামের এইসব কীর্তিকলাপ তৎকালীন পঞ্জাবের কমিউনিস্ট পার্টির শাখা এবং কীর্তি কিষাণ পার্টির অজানা ছিল না,তারা সবই জানত ।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশদের হয়ে ‘অফিসিয়ালি’কাজ শুরু করেন ভগত রাম। কোডনেম হয় “সিলভার” । ১৯৪৩ সাল থেকে ভগতরাম ব্রিটিশদের হয়ে পুরদমে কাজে নেমে পড়ে । ব্রিটিশরা দিল্লিতে ভগতরামের জন্য গৃহকর্মী এবং সিকিউরিটি গার্ড সমেত বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল । ভগতরাম হিল স্টেশন বা অন্য কোন জায়গায় বেড়াতে গেলে খরচ বহন করত। অবশ্যই কমিউনিস্ট ভগতরাম ব্রিটিশদের থেকে এক মোটা রকম অর্থ নেতাজির সঙ্গে বেইমানির পারিশ্রমিক হিসেবে আদায় করেছিল, ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার ই ডব্লিউ ওয়েস এই সত্য প্রকাশ্যে আনেন । তবে ভগতরাম ঠিক কত পরিমান টাকা পেয়েছিল সেটার উল্লেখ পাওয়া যায় না, কেননা ব্রিটিশরা স্বাধীনতার ঠিক আগে সমস্ত তথ্য নষ্ট করে দিয়ে যায়। ভগতরাম বাকি জীবন বেশ সচ্ছলভাবেই কাটায় ।সাভারকারের মুচলেকা আর পেনশন নিয়ে কমিউনিস্টরা গলা ফাটালেও নেতাজির সঙ্গে বেইমানি করা কমিউনিস্ট ভগতরামের সম্পর্কে একটা শব্দও উচ্চারণ করে না ।
নেতাজীর সঙ্গে কেন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ভগতরাম?
তৎকালীন বিপ্লবীদের জার্নাল থেকে যেটা জানা যায়, যেহেতু সোভিয়েত রাশিয়া এবং ব্রিটেন সেই সময় বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে আছে, তাই ব্রিটিশ বিরোধিতা হয়ে গিয়েছিল বামপন্থী কমিউনিস্টদের কাছে অপরাধ। ‘জন যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের বিরোধিতা করেছিল তারা। বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তার পুস্তকে লিখেছেন, “স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন চলিতেছিল তখন কম্যুউনিষ্ট পার্টি দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে (বিশ্বযুদ্ধ) “জনযুদ্ধ” বলিয়া প্রচার করিয়া দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিয়াছে। তাহারা ভারতের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয় নাই, রুশিয়ার বন্ধু বলিয়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই তখন কার্যতঃ সমর্থন করিয়াছেন।” তার এই দাবির জলজ্যান্ত উদাহরণ হল কমিউনিস্ট ভগতরাম । তিনিও তাঁর পার্টির লাইনেই চলছিলেন। যাদের কাছে দেশের থেকে দলীয় নীতিই হল সবার উপরে।।

