শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের নাম “গুণত্রয় বিভাগ যোগ”, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—প্রকৃতির এই তিন গুণের (গুণত্রয়) ব্যাখ্যা করেছেন, যা জীবকে সংসারে আবদ্ধ করে এবং কীভাবে এই গুণগুলিকে অতিক্রম করে পরম জ্ঞান লাভ করা যায়, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, সত্ত্বগুণ সুখের, রজোগুণ কর্মের এবং তমোগুণ আলস্য ও অজ্ঞানতার কারণ, এবং এই গুণত্রয়ের প্রভাবে জীবের জন্ম-মৃত্যু ও বন্ধন হয়, যা থেকে মুক্ত হওয়া যায় জ্ঞান ও নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে।
ওং শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
অথ চতুর্দশোঽধ্যায়ঃ ।
গুণত্রয়বিভাগয়োগঃ
শ্রীভগবানুবাচ
পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানমুত্তমম্ ।
যজ্জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ ॥ 1 ॥
ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ ।
সর্গেঽপি নোপজায়ংতে প্রলয়ে ন ব্যথংতি চ ॥ 2 ॥
মম যোনির্মহদ্ব্রহ্ম তস্মিন্গর্ভং দধাম্যহম্ ।
সংভবঃ সর্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত ॥ 3 ॥
সর্বয়োনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সংভবন্তি যাঃ ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা ॥ 4 ॥
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসংভবাঃ ।
নিবধ্নংতি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্ ॥ 5 ॥
তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাত্প্রকাশকমনাময়ম্ ।
সুখসংগেন বধ্নাতি জ্ঞানসংগেন চানঘ ॥ 6 ॥
রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসংগসমুদ্ভবম্ ।
তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসংগেন দেহিনম্ ॥ 7 ॥
তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহিনাম্ ।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত ॥ 8 ॥
সত্ত্বং সুখে সংজয়তি রজঃ কর্মণি ভারত ।
জ্ঞানমাবৃত্য় তু তমঃ প্রমাদে সংজয়ত্যুত ॥ 9 ॥
রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত ।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা ॥ 10 ॥
সর্বদ্বারেষু দেহেঽস্মিন্প্রকাশ উপজায়তে ।
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত ॥ 11 ॥
লোভঃ প্রবৃত্তিরারংভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা ।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ ॥ 12 ॥
অপ্রকাশোঽপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন ॥ 13 ॥
যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃত্ ।
তদোত্তমবিদাং লোকানমলান্প্রতিপদ্যতে ॥ 14 ॥
রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্মসংগিষু জায়তে ।
তথা প্রলীনস্তমসি মূঢয়োনিষু জায়তে ॥ 15 ॥
কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্ ।
রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্ ॥ 16 ॥
সত্ত্বাত্সংজাযতে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ ।
প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতোঽজ্ঞানমেব চ ॥ 17 ॥
ঊর্ধ্বং গচ্ছংতি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠংতি রাজসাঃ ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছংতি তামসাঃ ॥ 18 ॥
নান্য়ং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি ।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোঽধিগচ্ছতি ॥ 19 ॥
গুণানেতানতীত্য় ত্রীংদেহী দেহসমুদ্ভবান্ ।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোঽমৃতমশ্নুতে ॥ 20 ॥
অর্জুন উবাচ
কৈর্লিংগৈস্ত্রীন্গুণানেতানতীতো ভবতি প্রভো ।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্গুণানতিবর্ততে ॥ 21 ॥
শ্রীভগবানুবাচ
প্রকাশং চ প্রবৃত্তিং চ মোহমেব চ পান্ডব ।
ত দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাংক্ষতি ॥ 22 ॥
উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্য়ো ন বিচাল্যতে ।
গুণা বর্তংত ইত্যেব যোঽবতিষ্ঠতি নেংগতে ॥ 23 ॥
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাংচনঃ ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিংদাত্মসংস্তুতিঃ ॥ 24 ॥
মানাপমানয়োস্তুল্যস্তুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ ।
সর্বারংভপরিত্য়াগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে ॥ 25 ॥
মাং চ যোঽব্যভিচারেণ ভক্তিয়োগেন সেবতে ।
স গুণান্সমতীত্য়ৈতান্ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে ॥ 26 ॥
ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্য়াব্যযস্য চ ।
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্য়ৈকাংতিকস্য চ ॥ 27 ॥
।। ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে গুণত্রযবিভাগয়োগো নাম চতুর্দশোঽধ্যায়ঃ ॥
প্রধান বিষয়বস্তু:
গুণত্রয়ের পরিচয়:
সত্ত্বগুণ: বিশুদ্ধ, জ্ঞান ও সুখ প্রদানকারী।
রজোগুণ: আসক্তি ও কর্মের কারণ।
তমোগুণ: অজ্ঞানতা, প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রার কারণ।
গুণত্রয়ের প্রভাব:
এই গুণগুলিই জীবের জন্ম-মৃত্যু এবং সুখ-দুঃখের কারণ। সত্ত্বগুণ জ্ঞান ও সুখের দিকে, রজোগুণ কর্মের দিকে এবং তমোগুণ অজ্ঞানতার দিকে চালিত করে।
গুণাতীত অবস্থা:
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, তাঁর জ্ঞান লাভ করলে মানুষ এই গুণত্রয়কে জয় করে তাঁর নিজের মতো দিব্য (transcendental) অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
যারা নিষ্কামভাবে স্বধর্ম পালন করে, তারা এই গুণবন্ধন থেকে মুক্ত হয়।
৪. মূল শিক্ষা:
এই অধ্যায় প্রকৃতির তিন গুণের বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখায়, যা জ্ঞান ও কর্মযোগের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব, এবং সাধক কীভাবে গুণাতীত হয়ে পরমপদ লাভ করতে পারেন, তার নির্দেশনা দেয়।

