শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়টি ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ- বিভাগযোগ নামে পরিচিত, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ক্ষেত্র (দেহ/প্রকৃতি), ক্ষেত্রজ্ঞ (আত্মা/পুরুষ), জ্ঞান, জ্ঞেয় (জানার বিষয়), প্রকৃতি, পুরুষ এবং এই সমস্ত উপাদানের সম্পর্ক ও পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা দেন, যা জ্ঞান ও মোক্ষ লাভের পথ উন্মোচন করে। এটি দেহ, বুদ্ধি, মন, অহংকার, ইন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত ইত্যাদির বিবরণ দেয় এবং পরমাত্মার সাথে এদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে, যা সাধকের মুক্তি ও সাম্যবুদ্ধি লাভে সহায়ক।
ওং শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
অথ ত্রয়োদশোঽধ্য়ায়ঃ ।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগয়োগঃ
শ্রীভগবানুবাচ
ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে ।
এতদ্য়ো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ ॥ 1 ॥
ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত ।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্জ্ঞানং মতং মম ॥ 2 ॥
তত্ক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্চ যদ্বিকারি যতশ্চ যত্ ।
স চ যো যত্প্রভাবশ্চ তত্সমাসেন মে শৃণু ॥ 3 ॥
ঋষিভির্বহুধা গীতং ছন্দোভির্বিবিধৈঃ পৃথক্ ।
ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভির্বিনিশ্চিতৈঃ ॥ 4 ॥
মহাভূতান্যহংকারো বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ ।
ইংদ্রিয়াণি দশৈকং চ পংচ চেংদ্রিয়গোচরাঃ ॥ 5 ॥
ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ ।
এতত্ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্ ॥ 6 ॥
অমানিত্বমদংভিত্বমহিংসা ক্ষাংতিরার্জবম্ ।
আচার্য়োপাসনং শৌচং স্থৈর্যমাত্মবিনিগ্রহঃ ॥ 7 ॥
ইংদ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহংকার এব চ ।
জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখদোষানুদর্শনম্ ॥ 8 ॥
অসক্তিরনভিষ্বংগঃ পুত্রদারগৃহাদিষু ।
নিত্যং চ সমচিত্তত্ব-মিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু ॥ 9 ॥
ময়ি চানন্যয়োগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী ।
বিবিক্তদেশসেবিত্ব-মরতির্জনসংসদি ॥ 10 ॥
অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্ ।
এতজ্জ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোঽন্যথা ॥ 11 ॥
জ্ঞেয়ং যত্তত্প্রবক্ষ্য়ামি যজ্জ্ঞাত্বামৃতমশ্নুতে ।
অনাদিমত্পরং ব্রহ্ম ন সত্তন্নাসদুচ্যতে ॥ 12 ॥
সর্বতঃপাণিপাদং তত্সর্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্ ।
সর্বতঃশ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য় তিষ্ঠতি ॥ 13 ॥
সর্বেংদ্রিযগুণাভাসং সর্বেংদ্রিয়বিবর্জিতম্ ।
অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ ॥ 14 ॥
বহিরংতশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ ।
সূক্ষ্মত্বাত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চাংতিকে চ তত্ ॥ 15 ॥
অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্ ।
ভূতভর্তৃ চ তজ্জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ ॥ 16 ॥
জ্য়োতিষামপি তজ্জ্য়োতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে ।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য বিষ্ঠিতম্ ॥ 17 ॥
ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ ।
মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে ॥ 18 ॥
প্রকৃতিং পুরুষং চৈব বিদ্ধ্যনাদি উভাবপি ।
বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসংভবান্ ॥ 19 ॥
কার্যকারণকর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে ।
পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে ॥ 20 ॥
পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুংক্তে প্রকৃতিজান্গুণান্ ।
কারণং গুণসংগোঽস্য সদসদ্যোনিজন্মসু ॥ 21 ॥
উপদ্রষ্টানুমংতা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ ।
পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেঽস্মিন্পুরুষঃ পরঃ ॥ 22 ॥
য এবং বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ ।
সর্বথা বর্তমানোঽপি ন স ভূয়োঽভিজায়তে ॥ 23 ॥
ধ্যানেনাত্মনি পশ্যংতি কেচিদাত্মানমাত্মনা ।
অন্যে সাংখ্য়েন যোগেন কর্ময়োগেন চাপরে ॥ 24 ॥
অন্যে ত্বেবমজানংতঃ শ্রুত্বান্যেভ্য উপাসতে ।
তেঽপি চাতিতরংত্য়েব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণাঃ ॥ 25 ॥
যাবত্সংজায়তে কিংচিত্সত্ত্বং স্থাবরজংগমম্ ।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংয়োগাত্তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ ॥ 26 ॥
সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠংতং পরমেশ্বরম্ ।
বিনশ্যত্স্ববিনশ্যংতং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি ॥ 27 ॥
সমং পশ্যন্হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্ ।
ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥ 28 ॥
প্রকৃত্য়ৈব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ ।
যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি ॥ 29 ॥
যদা ভূতপৃথগ্ভাব-মেকস্থমনুপশ্যতি ।
তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সংপদ্যতে তদা ॥ 30 ॥
অনাদিত্বান্নির্গুণত্বা-ত্পরমাত্মায়মব্যয়ঃ ।
শরীরস্থোঽপি কৌংতেয় ন করোতি ন লিপ্যতে ॥ 31 ॥
যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্য়াদাকাশং নোপলিপ্যতে ।
সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে ॥ 32 ॥
যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃত্স্নং লোকমিমং রবিঃ ।
ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃত্স্নং প্রকাশয়তি ভারত ॥ 33 ॥
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়ো-রেবমংতরং জ্ঞানচক্ষুষা ।
ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং চ যে বিদুর্য়াংতি তে পরম্ ॥ 34 ॥
।।ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগয়োগো নাম ত্রয়োদশোঽধ্যায়ঃ ॥
ত্রয়োদশ অধ্যায়ের মূল বিষয়:
ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পরিচয়: কৃষ্ণ বলেন, এই দেহ (ক্ষেত্র) এবং দেহকে যে জানে (ক্ষেত্রজ্ঞ), সেই পরমাত্মা সম্পর্কে জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান ।
ক্ষেত্রের উপাদান: পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম), অহংকার, বুদ্ধি, অব্যক্ত (প্রকৃতি), দশ ইন্দ্রিয়, মন, দশ ইন্দ্রিয় বিষয় (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ), কামনা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সমষ্টি (দেহ), ধৃতি (সত্তা), এবং জ্ঞান (চেতনা) – এই সবকিছুই ক্ষেত্র (দেহ) এবং তার পরিবর্তন।
ক্ষেত্রজ্ঞের পরিচয়: vedabase.io, যিনি এই সমস্ত ক্ষেত্রের জ্ঞান রাখেন, তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ (আত্মা/পুরুষ)।
জ্ঞান ও অজ্ঞানের পার্থক্য: কেবল দেহ বা বস্তুকে জানা জ্ঞান নয়, বরং ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য উপলব্ধি করা এবং সর্বব্যাপী পরমাত্মাকে জানা হলো প্রকৃত জ্ঞান ।
পরমাত্মার স্বরূপ: শ্রীকৃষ্ণ নিজেকেই সমস্ত দেহের ক্ষেত্রজ্ঞ বা জ্ঞাতা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এই জ্ঞানই মুক্তি দেয়।
বন্ধন ও মুক্তি: যিনি এই জ্ঞান লাভ করে প্রকৃতির গুণাবলী (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) থেকে মুক্ত হন এবং সর্বত্র সমদৃষ্টি লাভ করেন, তিনি মোক্ষ বা পরম গতি প্রাপ্ত হন।
এই অধ্যায়টি মূলত প্রকৃতি (জড় জগৎ) ও পুরুষ (চৈতন্য) -এর পার্থক্য এবং উভয়ের মিলন (যোগ) ও বিচ্ছেদের তত্ত্ব আলোচনা করে, যা ভক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে পরম পুরুষার্থ লাভে সহায়ক।
