এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৮ জানুয়ারী : প্রাচীনকালে সতীদাহ ‘সতীদাহ’ নামে পরিচিত ছিল না। একে ‘সহমরণ’, ‘সহগমন’, ‘অনুগমন’,’অনুমরণ’ ইত্যাদি বলা হত। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর মৃতদেহের সাথে বিধবা পুড়ে মরলে তাকে সহমরণ বলা হত।স্বামী দূরদেশে মারা গেলে অথবা অন্য কোনো কারণে স্বামীর সাথে স্ত্রীকে একসাথে পোড়ানো না গেলে, স্বামীর পাগড়ী বা পাদুকার সাথে স্ত্রীকে পোড়ানো হলে তাকে অনুমরণ বলা হত। সহমৃতা নারীকে সতী বলা হত । কিন্তু প্রাচীন এই প্রথার চিত্রটাই উলটো করে দিলেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক ব্যানার্জি । তার কথায়,স্ত্রীর মৃত্যুর পর নাকি স্বামীরা আগুনে আত্মাহুতি দিতেন । যে প্রথা রাজা রামমোহন রায় বন্ধ করে গেছেন । এদিকে এই বিষয়ে অভিষেকের জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিজেপি । রাজ্য বিজেপির যুবমোর্চার সহ-সভাপতি তরুনজ্যোতি তিওয়ারি কটাক্ষ করেছেন,”সতীদাহ প্রথা অতীত, ইতিহাসের পাতা থেকে ভাইপো খুঁজে আনল পতিদাহ। নিজের পিসিকে কঠিন কম্পিটিশন দিচ্ছেন।”
দিন দুয়েক আগে একটি রাজনীতি সভাতে অভিযোগ ব্যানার্জি তার ভাষণে বলেন,’সতীদাহ প্রথা রোধ করেছিল একজন বাঙালি । তার নাম রামমোহন রায় । বিজেপির দালালরা এই রামমোহন রায়কে ব্রিটিশদের দালাল বলে আখ্যায়িত করে । রামমোহন রায় যদি আজকে না থাকত, আমার মা বা আপনার মা যদি মারা যেত, সেই চিতায় আমার বাবা বা আপনার বাবাকে ঝলসে পুড়ে মৃত্যু বরণ করতে হত ।’ ইতিহাস সম্পর্কে অভিষেকের এই প্রকার “স্বল্প জ্ঞান” নিয়ে এখন বিজেপি তাকে লাগাতার ট্রোল করছে । তরুনজ্যোতি তিওয়ারি অভিষের বক্তব্যের ক্লিপ ও একটা কার্টুন পোস্ট করেছেন,যেখানে মমতা ব্যানার্জি তার ভাপোর কান ধরে বলছেন, “সতীদাহ প্রথা পতিদাহ করে দিলি ।” উত্তরে অভিষেক বলছেন,”আর তুমি যে রাকেশ রোশনকে চাঁদে পাঠিয়েছিলে তার বেলা?” তিনি ভিডিওটি এক্স-এ শেয়ার করে লিখেছেন,’সতীদাহ প্রথায় নাকি স্ত্রী মারা গেলে স্বামীকে সহমরনে বাধ্য করা হতো—এই ঐতিহাসিক “আবিষ্কার” করে ফেললেন পিসির 12th pass ভাইপো। রাজা রামমোহন রায়, ইতিহাসবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়—সবাই ভুল। ঠিক শুধু ডায়মন্ড হারবার টেক্সটবুক।কিছুদিন আগেই বলেছিলেন, “বিজেপি করলে পাতাখোর, গাঁজাখোর হতে হয়।”এখন প্রশ্ন একটাই—ইতিহাস বিকৃত করতে গেলে উনি কী খান?বিনীত পরামর্শ, আবার প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হন।
তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারে ভর্তি হওয়ার আগে খোঁজ নেবেন—কে আসল শিক্ষক, আর কাকে চাকরি বিক্রি করে ঢোকানো হয়েছে।
কারণ অজ্ঞতা যদি চুপচাপ থাকে, সমস্যা নেই।
কিন্তু অজ্ঞতা যখন মাইকে উঠে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়, তখন সেটাই ট্র্যাজেডি।’
রাজ্য বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া পেজে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন কল্পনা করেন যে তাঁর অসংলগ্ন উচ্চারণ-“এপাং, ওপাং, ঝপাং”-তাঁকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমপর্যায়ে স্থান দেয়, আর সেই একই ধারাবাহিক অজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে তাঁর ‘ভাইপো’ এমন দাবি করলেন যে সতীদাহ প্রথা নাকি স্বামীদের নিজেদের স্ত্রীর চিতায় ঝাঁপ দেওয়ার রীতি ছিল! এটাই তৃণমূল কংগ্রেসের আসল চরিত্র-চরম অশিক্ষা, ইতিহাস সম্পর্কে ভয়াবহ অজ্ঞানতা। তৃণমূল কংগ্রেস না ইতিহাস বোঝে, না বাংলাকে চেনে, না বাঙালির ঐতিহ্যকে সম্মান করে। তারা কেবল ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য ‘বাঙালি অস্মিতা ’কে রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়, আর সেই অস্মিতাকেও তারা নামিয়ে এনেছে ফাঁকা স্লোগান আর ভণ্ডামির স্তরে।’ যদিও এই ভিডিও এর সত্যতা যাচাই করেনি এইদিন ।
উল্লেখ্য,হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর অন্ত্যেষ্টি চিতায় আত্মাহুতি দেওয়ার মাধ্যমে সহমরণের ঐতিহাসিক প্রথা চালু ছিল ভারতে । তবে কবে এবং কিভাবে এ ধরনের আচার ধর্মীয় প্রথারূপে গড়ে উঠেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গ্রিক লেখক ডিওডোরাস (প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এক সতীদাহের ঘটনার বর্ণনা দেন। এই বর্ণনার সঙ্গে আঠারো শতকের প্রচলিত সতীদাহ ব্যবস্থার প্রায় অবিকল মিল রয়েছে। অতীতে বিশ্বের বহু সমাজে মানুষের আত্মাহুতি প্রথার অস্তিত্ব ছিল বলে নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা মোটামুটি একমত। রাজপুতরা খুব ঘটা করে এই অনুষ্ঠানটি পালন করত। কিন্তু বাংলাসহ ভারতবর্ষের সকল প্রদেশে হিন্দুদের কোন কোন বর্ণের লোকেরা এই অনুষ্ঠান পালন করত ভিন্নতরভাবে। তুর্কি ও মুগল যুগে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয় নি।
ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার প্রথম দিকে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী ছিল না। সর্ব প্রথম ১৭৯৯ সালে খ্রিষ্টান যাজক ও বাংলায় গদ্য পাঠ্যপুস্তকের প্রবর্তক উইলিয়াম কেরি এই প্রথা বন্ধের প্রয়াস নেন। গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির কাছে তিনি সতীদাহ বন্ধের আবেদন জানান। এরপর রামমোহন রায় ১৮১২ সালে সতীদাহবিরোধী সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ও তাঁর লোকেরা বিভিন্নভাবে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এই প্রথা শুধু অমানবিকই নয়, বরং তা শাস্ত্র ও আইনবিরুদ্ধ। ১৮২১ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ’ শিরোনামের ছোট একটি পুস্তিকা।
১৮২৮ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন। তিনি সতীদাহ প্রথার কথা আগে থেকেই জানতেন। লর্ড বেন্টিঙ্কের কাছে রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য আবেদন করেন। লর্ড বেন্টিঙ্ক রামমোহনের যুক্তির সারবত্তা অনুভব করে আইনটি পাসে উদ্যোগী হন। ব্রিটিশ শাসনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে আইন পাস করেন।
খ্রিষ্টান মিশনারি, ব্রাহ্ম সমাজ ও প্রগতিশীল হিন্দুরা তাঁর পাশে দাঁড়ালেও হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল ব্যক্তিরা এই আইনকে হিন্দু ধর্মের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেন। সমাজের ধর্মীয় রক্ষণশীল ব্যক্তিরা ‘ধর্মসভা’ গঠন করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁরা লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আপিলও করেন। আপিলে অংশ নিতে দিল্লির বাদশাহ আকবরের সহায়তায় রামমোহন রায় ইংল্যান্ডে যান। বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, পুরাণ থেকে যুক্তি দেখিয়ে তিনি প্রিভি কাউন্সিলে প্রমাণ করেন, সতীদাহ প্রথা শুধু অমানবিকই নয়, উপরন্তু এটি হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রবিরোধী। ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউন্সিল রক্ষণশীল হিন্দুদের আপিল খারিজ করে লর্ড বেন্টিঙ্কের আদেশ বহাল রাখেন। এই বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর রামমোহনকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর ভারতবর্ষ থেকে সতীদাহ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ করতে আরও তিন দশক লেগে যায়।।

