এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাংলাদেশ,১৪ জানুয়ারী : তথাকথিত নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর গত সাত মাসে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক হিংসার শিকার হচ্ছে । যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান ।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারী—এই সাত মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে অন্তত ১১৬ জন সংখ্যালঘুকে হত্যা করা হয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের এই চলতি সাম্প্রদায়িক হিংসা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্তত ৪৫টি জেলায় এসব হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত করা হয়েছে। এইচআরসিবিএম একে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হিংসার “সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়” হিসেবে অভিহিত করেছে।
নিহতদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেখানে পরিকল্পিত হত্যা (Targeted Killing): মোট মৃত্যুর ৪৮.৩%। সন্দেহজনক মৃত্যু: ১২.৯% (যা সহিংসতার সময় ঘটে)। গণপিটুনি (Mob Lynching): ১০.৩%। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা: সেনাবাহিনী বা অন্যান্য বাহিনীর গুলিতে ৮.৬% এবং পুলিশ হেফাজতে ৬.৯% মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
এইচআরসিবিএম দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ড গুলোকে সাধারণ অপরাধ ভাবলে ভুল হবে। বরং এটি ‘কাঠামোগত হিংসা’। ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক হিংসার ধারাবাহিকতায় ১৯৫০, ১৯৬৪, ১৯৭১, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ১৯৪৬ সালে যেখানে সংখ্যালঘুর হার ছিল ৩০ শতাংশ, ২০২০ সালে তা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। একে একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দীপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে মুসলিম জনতা তাকে পিটিয়ে ও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ সময়মতো হস্তক্ষেপ না করায় জনতা সহিংস হতে সাহস পেয়েছে। এই ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে এইচআরসিবিএম ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের জন্য ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তি’র পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে বা সঠিক তদন্ত করতে অনীহা প্রকাশ করে। পরিসংখ্যানের বাইরেও বাংলাদেশের এই সাম্প্রদায়িক হিংসা তৈরি করেছে মানবিক বিপর্যয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে তাদের মৃত্যুতে অসংখ্য পরিবার, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্করা এখন চরম আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ।।

