ইরানে চলমান বিক্ষোভ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক অসন্তোষ বা সামাজিক ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শাসকের সঙ্গে সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি এই আন্দোলনকে সরাসরি শাসনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অসংখ্য ইরানি নাগরিক প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের অবসান দাবি করছেন। অন্যদিকে খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ধর্মদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ার করেছেন, রাজপথ না ছাড়লে মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য। কিন্তু হুমকির মুখেও রাজপথ ছাড়েনি মানুষ। সশস্ত্র বাহিনী অবস্থান নিয়েছে প্রতিবাদকারীদের বিপরীতে। লাশের মিছিল নিয়েই পারস্যের প্রতিবাদকারীরা এগিয়ে চলেছে রাষ্ট্রীয় অস্ত্রের মুখোমুখি।
এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছরে যে বাস্তবতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, বর্তমান বিস্ফোরণ সেই দীর্ঘ জমে থাকা ক্ষোভেরই প্রকাশ। একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে ক্রমাগত চাপে রেখেছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর সহ্য করতে হয়েছে কঠোর দমন–পীড়ন। এই দুই চাপের সম্মিলিত অভিঘাতেই আজকের ইরান দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর সংকটের মুখে।
ইরান বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। কুর্দি, বালুচ, আরবসহ নানা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আসছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে এসব অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন বা বিচ্ছিন্নতার দাবি জোরালো হতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে পারে। এতে দেশ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী হিংসা ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
১৯৭৯ সালের পর ‘বিপ্লব রক্ষার’ নামে দেশটির শাসকগোষ্ঠী ধীরে ধীরে নাগরিকের ওপর সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। নারীদের নাগরিক অধিকার ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত করা হয়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় নৈতিক পুলিশের মাধ্যমে। নাগরিকের ওপর নজরদারি পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় নীতিতে। ভিন্নমত দমন করা হয় ভয় ও শাস্তির মাধ্যমে, যেখানে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড হয়ে ওঠে শাসনের প্রদর্শনী। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য এবং নিপীড়নকে স্বাভাবিক করে তোলা হয় রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরেই।
এই দীর্ঘ চার দশকে ইরানের সমাজে জমে উঠেছে ক্ষোভ, হতাশা এবং অপমানবোধ। বর্তমান বিক্ষোভ সেই আবেগের আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি এক প্রজন্মব্যাপী চেপে রাখা ক্রোধের বিস্ফোরণ, যা আর রাষ্ট্রীয় শক্তির ভয় দেখিয়ে দমন করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, যদি এই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে ইরান কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে?
এই প্রশ্নের কোনো সহজ বা একক উত্তর নেই। ইতিহাস আমাদের শেখায়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান মানেই গণতন্ত্রের সূচনা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই শাসনের পতনের পরের সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গত দুই শতাব্দীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কোথাও কোথাও স্বৈরশাসন উৎখাত করতে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, তার চেয়েও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন কর্তৃত্ববাদী শাসন পতনের পরের বিশৃঙ্খলায়, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে।
খামেনি যুগের অবসানের পর ইরানের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গভীর ঝুঁকি হলো ক্ষমতার শূন্যতা। ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো অত্যন্ত কেন্দ্রনির্ভরন । সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আধা সামরিক বাহিনী সরাসরি খামেনির শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে হঠাৎ করে এই শাসনের পতন ঘটলে এবং দ্রুত কোনো বিশ্বাসযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিতে না পারলে নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতর থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে।
কে আদেশ দেবে, কে মানবে—এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে অচল করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবী গার্ডের কোনো অংশ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারে, আবার বাহিনীগুলো নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। ফলে গণতন্ত্রের বদলে নতুন কর্তৃত্ববাদী বা অস্থিতিশীল বন্দোবস্তের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে দেশটি।
এর পরেই যে আশঙ্কা সামনে আসে, তা হলো ভৌগোলিক ও জাতিগত অস্থিরতা। ইরান বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। কুর্দি, বালুচ, আরবসহ নানা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আসছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে এসব অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন বা বিচ্ছিন্নতার দাবি জোরালো হতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে পারে। এতে দেশ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী হিংসা ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পারমাণবিক নিরাপত্তা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেবে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিগুলো এ ধরনের স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, যা গোটা অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আঞ্চলিক অস্থিরতাও একটি বড় ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য । ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর ইরানের প্রভাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে এসব নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকে পড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। ইরান একটি বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ হয়। ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা মানেই এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, যার ফল হিসেবে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই বর্তমান বিক্ষোভের মূল কারণ। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এসব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না। বরং প্রশাসনিক অচলাবস্থায় বেতন, ভর্তুকি ও সামাজিক সেবা ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সাধারণ মানুষ দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়বে। সেই হতাশা মানুষকে আবার ‘শক্ত হাতে শাসন’-এর দিকেই ঠেলে দিতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ হতে পারে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঝুঁকি। ইতিহাস বলে, কোনো রাষ্ট্র দুর্বল হলেই সেখানে বাইরের শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হয়। গণতন্ত্র, নিরাপত্তা বা পারমাণবিক ঝুঁকির নামে হস্তক্ষেপ প্রায়ই জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মেলে না। এতে অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হয়।
সবশেষে বলা যায়, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন নিশ্চিত করা দেশটি জনগণের জন্য যেমন গণতান্ত্রিক উত্তরণের ঐতিহাসিক সুযোগ, তেমনই তা ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনাও হতে পারে। মূল প্রশ্নটা শাসকের পতন নয়, বরং পতনের পর রাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে সামলে নেয়। কারণ, রাষ্ট্র যদি ভেঙে পড়ে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। তবে বিকল্প নেই যে তা নয় । একটাই বিকল্প হল ইরানে রাজতন্ত্রের পুণঃপ্রতিষ্ঠা ৷ নির্বাসন থেকে ফিরে এসে শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি যদি ইরানের হাল ধরেন ।।

