শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়টি হল অক্ষর ব্রহ্ম যোগ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ‘ব্রহ্ম’, ‘অধ্যত্ম’, ‘কর্ম’, ‘অধিভূত’, ‘অধিদৈব’ ও ‘অধিযজ্ঞ’ সম্পর্কে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে জ্ঞান দেন, এবং মৃত্যুর মুহূর্তে কৃষ্ণকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করলে কিভাবে তাঁর ধামে (পরম গতি) পৌঁছানো যায়, সেই বিষয়ে শিক্ষা দেন, যা মূলত ভক্তি ও অবিচল মনোযোগের মাধ্যমে মোক্ষ লাভের পথ নির্দেশ করে।
ওং শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
অথ অষ্টমোঽধ্য়ায়ঃ ।
অক্ষরপরব্রহ্ময়োগঃ
অর্জুন উবাচ
কিং তদ্ব্রহ্ম কিমধ্যাত্মং কিং কর্ম পুরুষোত্তম ।
অধিভূতং চ কিং প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে ॥ 1 ॥
অধিযজ্ঞঃ কথং কোঽত্র দেহেঽস্মিন্মধুসূদন ।
প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়োঽসি নিযতাত্মভিঃ ॥ 2 ॥
শ্রীভগবানুবাচ
অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং স্বভাবোঽধ্যাত্মমুচ্যতে ।
ভূতভাবোদ্ভবকরো বিসর্গঃ কর্মসংজ্ঞিতঃ ॥ 3 ॥
অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্ ।
অধিযজ্ঞোঽহমেবাত্র দেহে দেহভৃতাং বর ॥ 4 ॥
অংতকালে চ মামেব স্মরন্মুক্ত্বা কলেবরম্ ।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ ॥ 5 ॥
যং যং বাপি স্মরন্ভাবং ত্যজত্যংতে কলেবরম্ ।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ॥ 6 ॥
তস্মাত্সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ ।
ময়্যর্পিতমনোবুদ্ধির্মামেবৈষ্যস্যসংশয়ম্ ॥ 7 ॥
অভ্যাসয়োগয়ুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা ।
পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়ন্ ॥ 8 ॥
কবিং পুরাণমনুশাসিতারমণোরণীয়ংসমনুস্মরেদ্যঃ ।
সর্বস্য ধাতারমচিংত্যরূপমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাত্ ॥ 9 ॥
প্রয়াণকালে মনসাচলেন ভক্ত্যা যুক্তো যোগবলেন চৈব।
ভ্রুবোর্মধ্য়ে প্রাণমাবেশ্য সম্যক্স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্ ॥ 10 ॥
যদক্ষরং বেদবিদো বদংতি বিশংতি যদ্যতয়ো বীতরাগাঃ।
যদিচ্ছংতো ব্রহ্মচর্য়ং চরংতি তত্তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্য়ে ॥ 11 ॥
সর্বদ্বারাণি সংযম্য মনো হৃদি নিরুধ্য চ ।
মূর্ধ্ন্যাধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতো যোগধারণাম্ ॥ 12 ॥
ওমিত্য়েকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্মামনুস্মরন্ ।
যঃ প্রয়াতি ত্যজংদেহং স যাতি পরমাং গতিম্ ॥ 13 ॥
অনন্যচেতাঃ সততং যো মাং স্মরতি নিত্যশঃ ।
তস্যাহং সুলভঃ পার্থ নিত্যয়ুক্তস্য যোগিনঃ ॥ 14 ॥
মামুপেত্য় পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বতম্ ।
নাপ্নুবংতি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ ॥ 15 ॥
আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোঽর্জুন ।
মামুপেত্য় তু কৌংতেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে ॥ 16 ॥
সহস্রয়ুগপর্য়ংতমহর্যদ্ব্রহ্মণো বিদুঃ ।
রাত্রিং যুগসহস্রাংতাং তেঽহোরাত্রবিদো জনাঃ ॥ 17 ॥
অব্যক্তাদ্ব্যক্তয়ঃ সর্বাঃ প্রভবংত্যহরাগমে ।
রাত্র্য়াগমে প্রলীয়ংতে তত্রৈবাব্যক্তসংজ্ঞকে ॥ 18 ॥
ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে ।
রাত্র্যাগমেঽবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে ॥ 19 ॥
পরস্তস্মাত্তু ভাবোঽন্যোঽব্যক্তোঽব্যক্তাত্সনাতনঃ ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যত্সু ন বিনশ্যতি ॥ 20 ॥
অব্যক্তোঽক্ষর ইত্য়ুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্ ।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তংতে তদ্ধাম পরমং মম ॥ 21 ॥
পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্য়া লভ্যস্ত্বনন্যয়া ।
যস্য়াংতঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং ততম্ ॥ 22 ॥
যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ ।
প্রয়াতা যাংতি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভ ॥ 23 ॥
অগ্নির্জোতিরহঃ শুক্লঃ ষণ্মাসা উত্তরায়ণম্ ।
তত্র প্রয়াতা গচ্ছংতি ব্রহ্ম ব্রহ্মবিদো জনাঃ ॥ 24 ॥
ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্ ।
তত্র চাংদ্রমসং জ্য়োতির্য়োগী প্রাপ্য নিবর্ততে ॥ 25 ॥
শুক্লকৃষ্ণে গতী হ্য়েতে জগতঃ শাশ্বতে মতে ।
একয়া যাত্যনাবৃত্তিমন্যয়াবর্ততে পুনঃ ॥ 26 ॥
নৈতে সৃতী পার্থ জানন্য়োগী মুহ্যতি কশ্চন ।
তস্মাত্সর্বেষু কালেষু যোগয়ুক্তো ভবার্জুন ॥ 27 ॥
বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চৈব দানেষু যত্পুণ্যফলং প্রদিষ্টম্।
অত্য়েতি তত্সর্বমিদং বিদিত্বায়োগী পরং স্থানমুপৈতি চাদ্যম্ ॥ 28 ॥
।। ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্য়ায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে অক্ষরব্রহ্ময়োগো নামাষ্টমোঽধ্য়ায়ঃ ॥
মূল বিষয়বস্তু:
প্রশ্ন ও উত্তর (শ্লোক ১-৪): অর্জুন ব্রহ্ম, আত্মা (অধ্যত্ম), কর্ম, অধিভূত (পরিবর্তনশীল সত্তা), অধিদৈব (দেবতাদের নিয়ন্ত্রক), এবং অধিযজ্ঞ (যিনি হৃদয়ে বিরাজমান) সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এগুলির সংজ্ঞা দেন।
মৃত্যুকালে স্মরণ (শ্লোক ৫-৭): যিনি মৃত্যুর সময় কৃষ্ণকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি কৃষ্ণকে লাভ করেন। অবিচলিত মন নিয়ে কৃষ্ণকে স্মরণ করলে মোক্ষ লাভ হয়, এবং কৃষ্ণকে সর্বদা স্মরণ করার উপায়ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পরম গতি (শ্লোক ৮-১০): অনুশীলনের মাধ্যমে অবিচল চিত্তে কৃষ্ণকে স্মরণ করলে তাঁকে লাভ করা যায়। কৃষ্ণকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করলে তাঁর ধামে পৌঁছানো যায়, যা জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি দেয়।
কৃষ্ণই পরম সত্তা (শ্লোক ১১-১৫): কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন যে ‘অক্ষর’ (অবিনশ্বর) ব্রহ্ম,’অধ্যত্ম’ (স্বভাব), এবং ‘কর্ম’ (সৃষ্টির কারণ) হল তাঁরই অংশ। যিনি কৃষ্ণকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি তাঁর ধামে পৌঁছান।
কালচক্র ও মুক্তি (শ্লোক ১৬-২৬): অধ্যায়ে কালচক্র (সৃষ্টি ও প্রলয়) এবং বিভিন্ন মার্গের (যেমন, শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষ) মাধ্যমে আত্মার গতির আলোচনা আছে। কৃষ্ণ বলছেন, তাঁর ভক্তি করলে মানুষ জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন অতিক্রম করতে পারে।
যোগীর চূড়ান্ত লক্ষ্য (শ্লোক ২৮): এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, যোগী সর্বদা এই জ্ঞান অভ্যাস করলে মৃত্যুর পর মোক্ষ লাভ করে।
তাৎপর্য:
এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বোঝান যে, জীবনের শেষ মুহূর্তে মনকে কোথায় নিবদ্ধ করা হচ্ছে, তার ওপরই পরকাল নির্ভর করে। তাই, মৃত্যুকালে কৃষ্ণকে স্মরণ করার জন্য সারা জীবন ভক্তি ও নিরন্তর অভ্যাসের মাধ্যমে মনকে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন, যা মোক্ষের পথ প্রশস্ত করে।।

