এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাংলাদেশ,১২ জানুয়ারী : শীত মানেই পৌষ সংক্রান্তি,পিঠেপুলি,খেজুর গুড়ের গন্ধে ভরে ওঠার একটা ঋতু । বহুল জনপ্রিয় উৎসব বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে । কিন্তু এই জনপ্রিয় লোকউৎসবটি বাংলাদেশের একশ্রেণীর ইসলামপন্থীদের কাছে ইসলামসম্মত নয়….”হারাম” । যেকারণে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় পৌষ সংক্রান্তির মতো লোকউৎসব পালন না করার আহ্বান জানাচ্ছে ইসলামপন্থীরা ।
সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদকেন্দ্রিক বক্তৃতা, লিফলেট এবং সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে কিছু এলাকায় বলা হচ্ছে যে পৌষ সংক্রান্তি ইসলামসম্মত নয়। এই উৎসব পালনে ধর্মীয় বিধি লঙ্ঘন হয় । যদিও এই আহ্বান শাসক মোল্লা মহম্মদ ইউনূসের সরকারি কোনও দপ্তরের ঘোষণার অংশ নয়, তবু এর প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলের সামাজিক জীবনে। পিঠেপুলি আর খেজুর গুড় খেতে গিয়ে জিহাদিদের হামলার মুখে পড়তে হবে কিনা এনিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে এলাকার বাসিন্দারা ।
গ্রাম বাংলায় পৌষ সংক্রান্তি মূলত একটি কৃষিজ উৎসব। ধান কাটা শেষে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পরিবার ও প্রতিবেশীরা একত্র হন। পিঠে উৎসব, নবান্নের আয়োজন, লোকগান এবং মেলাকে ঘিরেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এই উৎসবের রীতি। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে এই লোকাচার বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে বলে মত সংস্কৃতিবিদদের । এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতিও । খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করার কাজে মূলত মুসলিমরাই যুক্ত । সারা বছরের রোজকার এই সময়েই করে তারা । এখন যদি এই উৎসব ইসলামপন্থীদের কোপে পড়ে তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে তাদের রুটিরুজির উপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মাহবুব আলমের বক্তব্য, ‘লোকউৎসব কোনও ধর্মীয় আচারের বিকল্প নয়। এগুলি সামাজিক বন্ধনকে শক্ত করে। যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এই ধরনের উৎসবকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়, তখন তা আসলে সমাজের বহুত্ববাদী চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।’
বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, কোনও উৎসব পালনে বাধা দেওয়ার আহ্বান পরোক্ষভাবে মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। যদিও এখনও পর্যন্ত বড় আকারের সংঘাতের খবর নেই, তবু ভয় ও দ্বিধা তৈরি হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেক জায়গায় প্রকাশ্যে পিঠে উৎসব বা মেলা আয়োজন করতে অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসলামি চিন্তাবিদদের একটি অংশ এই আহ্বানের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, ইসলাম মানুষের সংস্কৃতি ও সামাজিক আনন্দকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে না। ধর্মের নামে লোকজ সংস্কৃতিকে এককাঠি করা হলে তা ভুল ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি স্তরে এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত, সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় থাকতেই এই বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে অকারণ সংঘাত তৈরি না হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে লোকসংস্কৃতির বিকাশ, সব ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক পরিচয় দেশের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই ঐতিহ্যকে খাটো করার চেষ্টা হলে তা কেবল একটি উৎসব নয়, গোটা সমাজের মননকেই সংকুচিত করে। পৌষ সংক্রান্তির বিতর্ক তাই নিছক একটি দিনের উৎসব ঘিরে নয়। এটি প্রশ্ন তুলছে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটতে চায়। বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পথে, না কি সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বেড়াজালে আবদ্ধ এক সমাজের দিকে। এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনে দেশের সামাজিক সুর নির্ধারণ করবে। তবে কট্টর ইসলামের উত্থান বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তানের নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে ।।

