যার রূপের ঝলকে মুগ্ধ হয়েছিল গোটা বিশ্ব । বড় বড় কোম্পানি তাকে ব্রান্ড অ্যাম্বেসডর করার জন্য পিছু পিছু ছুটতো । অভিনয় জগত যার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিল । নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই সুন্দরী তরুনীর জীবনে যখন বিপর্যয় নেমে আসে তখন পাশ থেকে সবাই সরে যায় ৷ মেকি মানবতাবাদীদের নিদারুন অবহেলার শিকার হয়ে মাত্র ২৪ বছর বয়সেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করতে হয় তাকে । তিনি হলেন নেপালি সুন্দরী অভিনেত্রী নিশা ঘিমিরে (Nisha Ghimire) ।
নেপালের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিশা ঘিমিরের । অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে জন্ম হয় তার । বয়স বাড়ার সাথে সাথেই তার রূপের ঝলকে মুগ্ধ হয়ে ওঠে গোটা দেশ৷ পরিবারের সীমাহীন অভাবকে কাটিয়ে উঠতে যৌবনে উত্তীর্ণ হতেই মডেলিং ও সিনেমা জগতে আত্মপ্রকাশ করেন নিশা ৷ তিনি কেবল নিজের প্রত্যাশা পূরণই নয়, তার পুরো পরিবারের প্রত্যাশাও কাঁধে বহন করেছিলেন। এমনকি অল্প বয়স থেকেই তিনি ভাইবোনদের শিক্ষার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন৷ একটি সাধারণ পরিবারের এই মেয়েটি স্বপ্ন দেখতেন, “আমি এগিয়ে যাব, এবং আমি আমার পরিবারকেও এগিয়ে নিয়ে যাব।”
এদিকে একজন উদীয়মান শিল্পী হিসাবে তার মধ্যে অকুত সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে ৷ ইতিমধ্যে নিশা ভোজপুরি ছবি ‘মাধেসী পুত্র ২’ এবং টিভি সিরিজ ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ সহ কয়েকটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয়ও করে ফেলেছেন। এছাড়া দুই ডজনেরও বেশি মিউজিক ভিডিওতে মডেলিং করেছেন । আরও ভালো ক্যারিয়ার গড়ার আশায়, তিনি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অভিনয়ের ডিপ্লোমা পড়ার জন্য গিয়েছিলেন। সেই সময় তার জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে ছোটো উদ্যোগপতি মেঘা চৌধুরীর কোম্পানির ব্রান্ড অ্যাম্বেসেডর হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় নিশার ম্যানেজার । সরাসরি মেঘা চৌধুরীর মুখের উপর নিশার ম্যানেজার বলে দেয়, “তোমার কোম্পানি অনেক ছোট, তাই নিশার সাথে তোমার ব্র্যান্ড মানানসই হবে না।” ২০১৮-১৯ সালে তার ক্যারিয়ার আকাশছোঁয়া ছিল। ব্র্যান্ড, প্রচারণায় নিশা ঘিমিরের নাম সর্বত্র প্রতিধ্বনিত হয়েছিল । নেপাল এবং ভারতের রাজনীতি এবং বিনোদন জগতের সেলিব্রিটিরা তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু ভাগ্য নিশা ঘিমিরের জন্য অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল ।
দেরাদুনে যাওয়াই কাল হয়েছিল নিশার । দেড় মাসের মাথায় তিনি একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন এবং কথা বলতে বা হাঁটাচলার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন । এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাতেই নিশার স্বপ্ন, আশা আকাঙ্খা সবকিছু শেষ হয়ে যায় । তার পরিবারের পক্ষে ভারতে তার ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না । এদিকে যারা তার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা সবাই অদৃশ্য হয়ে যায়৷ যে বন্ধুরা তার সাথে ছবি তুলতে এবং ইন্টারনেটে শেয়ার করে লাইক ভিউ পেতে লালায়িত ছিল,তারাও হাত গুটিয়ে নিয়ে সরে পড়ে৷ এমনকি নিজের ম্যানেজার পর্যন্ত নিশাকে ছেড়ে পালায়৷ যেকারণে নিশাকে নেপালে ফেরত পাঠানো হয় তার মৃত্যুর অপেক্ষা করার জন্য ।
নেপালে আনার পর নিশা ঘিমিরকে ভর্তি করা হয় কাঠমান্ডুর নরভিক হাসপাতালে ৷ ট্রমা সেন্টারে তিন মাস ধরে তার চিকিৎসা করা হয়েছিল, কিন্তু তার অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি । ধীরে ধীরে নিশার শরীর শীর্ণকায় হয়ে পড়ে । নরভিক হাসপাতালের ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে বিভিন্ন মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ এবং ক্রমবর্ধমান কোভিড-১৯ সংক্রমণের হারের কারণে,পরিবার নিশাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে৷
এদিকে নিশার এই করুন পরিনতির কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় উদ্যোগপতি মেঘা চৌধুরী জানতে পেরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন । তিনি নিশার সমস্ত চিকিৎসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন । তখন নিশার নিজের ম্যানেজারও পালিয়ে গেছে এবং তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মেঘা ফের নিশাকে নরভিকে হাসপাতালের ভর্তি করে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন ।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, তিনি ব্যর্থ হন। ০১.০৯.২০২১ তারিখ, বুধবার সকালে তার হৃদপিণ্ড এবং লিভার কাজ করা বন্ধ করে দেয় । সকালে হাসপাতালের মুখপাত্র সোমনাথ বানস্তোলা জানান, সকাল থেকে নিশা ঘিমিরের স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করে এবং ক্রমাগত চিকিৎসার পরেও তার স্বাস্থ্যের কোনও উন্নতি হয়নি । এরপর সন্ধ্যা ৬:৫ মিনিটে নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সম্ভাবনাময় মডেল ও অভিনেত্রী নিশা ঘিমির। মেঘাই শেষকৃত্যের খরচ বহন করেছিলেন ।।

